দেনমোহর কী
দেনমোহর (মোহর, মোহরানা, বা অনেকে শুধু "কাবিন" বলেন) হলো বিয়ের চুক্তির অংশ হিসেবে বরের পক্ষ থেকে কনেকে দেওয়া উপহার। এটি শুধুই কনের — তাঁর মা-বাবার নয়, সংসারেরও নয়। বাংলাদেশে দেনমোহর কাবিননামায় লেখা হয়, তাই এটি একই সাথে ধর্মীয় দায়িত্ব এবং আইনি দেনা।
নারীদের তাঁদের মোহর খুশিমনে, উপহার হিসেবে দিয়ে দাও। তবে তাঁরা নিজে থেকে খুশি হয়ে তার কিছু অংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারো।
তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর
সাধারণত দেনমোহর দুই ভাগে ভাগ করা হয়, আর কাবিননামায় দুটিই লেখা থাকে:
- তাৎক্ষণিক দেনমোহর (মু'আজ্জল)
- সাথে সাথে পরিশোধযোগ্য — কনে যেকোনো সময় চাইতে পারেন। বিয়ের দিন যতটা দেওয়া হয়, তা "উসুল" (পরিশোধিত) হিসেবে লেখা হয়।
- বিলম্বিত দেনমোহর (মু'অজ্জল)
- পরে পরিশোধযোগ্য। বিয়ে শেষ হলে — তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে — সর্বশেষ তখন এটি পরিশোধ করতে হয়, আর স্বামীর সম্পত্তির ওপর এটি অন্য যেকোনো দেনার মতোই দেনা।
কত হবে? পরিবার কীভাবে ঠিক করে
সারা মুসলিম বিশ্বের জন্য ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক বেঁধে দেয়নি, আর সর্বনিম্ন পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন মাযহাবের আলেমদের মত ভিন্ন। তবে সবাই একমত যে পরিমাণটি দুই পক্ষ মিলে ঠিক করবে, আর কনে তাতে সম্মতি দেবেন। বাস্তবে বাঙালি পরিবার যা বিবেচনা করে:
- বর আসলে কতটা দিতে পারবেন — এখন, এবং পরে।
- পারিবারিক রীতি — দুই পরিবারের বোন বা চাচাতো-মামাতো বোনদের বেলায় কত ঠিক হয়েছিল।
- পরিমিতি। বিয়ে সহজ রাখতে অনেক আলেম সাধ্যের মধ্যে দেনমোহর রাখতে উৎসাহ দেন; আবার অনেকে মনে করিয়ে দেন যে বড় অঙ্কও জায়েজ (কুরআনে "স্বর্ণের স্তূপ"-এর কথাও আছে, ৪:২০)। দুটি মতই সম্মানের যোগ্য।
- কনে কী চান। এটি তাঁর অধিকার, তাই তাঁর মতই আগে — চাচা বা প্রতিবেশীর মত নয়।
দেনমোহর টাকা, সোনা বা সম্পত্তি — কিংবা মিলিয়ে — হতে পারে। সোনা হলে শুধু আজকের দাম নয়, ওজন লিখুন (যেমন "২২ ক্যারেটের ৫ ভরি সোনা")।
এটি কনের অধিকার — তালাকের পরও
- দেনমোহর তিনি রাখবেন, খরচ করবেন বা কাউকে দেবেন — সিদ্ধান্ত তাঁর। অন্য কেউ তা নিতে পারে না।
- বাংলাদেশে বিয়ে শেষ হলে অপরিশোধিত দেনমোহর দেনা হিসেবেই থেকে যায় — তালাক যে পক্ষই দিক — যদি না স্ত্রী নিজে বিচ্ছেদ চেয়ে (খুলা) স্বেচ্ছায় তা ছেড়ে দেন। তিনি পারিবারিক আদালতে তা দাবি করতে পারেন।
- একসাথে বসবাস শুরুর আগেই তালাক হলে নির্ধারিত দেনমোহরের অর্ধেক দিতে হয় (কুরআন ২:২৩৭)।
- স্ত্রী চাইলে দেনমোহরের কিছু বা পুরোটা মাফ করতে পারেন, তবে শুধু নিজের ইচ্ছায়। চাপ দিয়ে "মাফ" করানো আসলে মাফ নয়।
দেনমোহর আর যৌতুক এক নয়
দেনমোহর যায় বরের কাছ থেকে কনের কাছে। যৌতুক যায় উল্টো দিকে — কনের পরিবারের কাছ থেকে চাওয়া টাকা, আসবাব, মোটরসাইকেল বা "উপহার"। দুটি একেবারে বিপরীত।
প্রবাসী দম্পতিদের জন্য
বাংলাদেশে বিয়ে হলে কাবিননামায় দেনমোহর লেখা থাকে, আর বাংলাদেশের আদালত তা আদায় করাতে পারে। বিদেশে বিয়ে হলে মসজিদের নিকাহ সার্টিফিকেটে তা লেখা থাকতে পারে, কিন্তু যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার আদালত বিষয়টি কীভাবে দেখবে, তা স্থানীয় আইন আর বিয়েটি সেখানে আইনগতভাবে নিবন্ধিত কি না, তার ওপর নির্ভর করে। দেখুন যুক্তরাজ্যে নিকাহ কি আইনত বৈধ?, আর বড় অঙ্ক হলে স্থানীয় পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
ঝগড়া ছাড়া কীভাবে আলাপ করবেন
- আগে পাত্র ও পাত্রী নিজ নিজ মা-বাবাকে একান্তে নিজের মত জানান।
- আত্মীয়দের দর-কষাকষি নয়; দুই পরিবারের বাবা বা অভিভাবকের মধ্যে একটি শান্ত আলাপ হোক।
- পরিমাণ, তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত অংশের ভাগ, আর বিয়ের দিন কতটা দেওয়া হবে — ঠিক করুন।
- কাবিননামায় ঠিক সেই অঙ্কগুলোই লিখুন — "দেখানোর জন্য" কোনো অঙ্ক নয়।